চন্দ্রিমা উদ্যান যেন ভালবাসার মেলা : ভাড়ায় মেলে প্রেমিকা

চন্দ্রিমা উদ্যান। এমপি হোস্টেলের গেটের ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে উদ্যানে যাওয়ার প্রবেশপথ পেরিয়ে খানিকটা দূরে সবুজ ঘাসের ওপর বসে অঝোরে কাঁদছে এক কিশোরী। তাকে ঘিরে এক জটলা। জটলার সাত জনের মধ্যে চারজন কিশোরী, মাঝবয়সী দু’জন। ওরা মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সান্ত্বনা তো নয় নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনার পাশাপাশি একনাগাড়ে নিজেদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা বলে যাচ্ছে। কবে কখন কোন পুরুষ ভাড়ার টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেছে, কে তিন ঘণ্টা গল্প আর গা টিপিয়ে নিয়ে শেষে মাস্তানি করে চলে গেছে, চুক্তিমতো ডেটিং ভাড়ার ২শ’ টাকা দেয়নি- ওই সব কথা বলে ওরা প্রবোধ দিচ্ছিল মেয়েটিকে। মাঝবয়সী একজন বলছিলেন, ‘এই লাইনে নতুন আইছো তো আরও কত দেখবা! ব্যাটারা কি শয়তান।’ ওদের কথা শুনে লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছিল মেয়েটি। শুক্রবার বেলা আড়াইটার মতো হবে চন্দ্রিমা উদ্যানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ওই জটলার দৃশ্য। দু’এক পা এগিয়ে কাছে গিয়ে ওদের কথার সঙ্গে সুর মেলাই, ধীরে ধীরে পাওয়া যায় জটলার রহস্য। মেয়েটির নাম শারমিন। বাড়ি গাজীপুরের কোনাবাড়ি। ধবধবে ফর্সা চেহারা। পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার কামিজ। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা এগোয়নি। উত্তরা এলাকার এক যুবকের সঙ্গে তার ছয় মাস ধরে পরিচয় মোবাইল ফোনে। এর আগে একবার দেখা হয়েছে গাজীপুরে। ওই যুবকের নাম শাকিল। শাকিল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছে। শাকিল তাকে প্রস্তাব দেয় পুরো দিন তার সঙ্গে চন্দ্রিমা উদ্যানে ডেটিং করলে ১০০০ টাকা দেবে। রাজি হয় শারমিন। কেবলমাত্র কোনাবাড়ি থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান পর্যন্ত ভাড়ার টাকা যোগাড় করে চলে আসে সকাল দশটায়। ২টা পর্যন্ত অন্তরঙ্গ পরিবেশে কাটিয়ে খাবার আনার কথা বলে কেটে পড়ে শাকিল নামের ওই যুবক। বাড়ি ফেরার ভাড়া না থাকায় অঝোরে কাঁদছে শারমিন।
তুমুল ঝগড়া চলছে চন্দ্রিমা উদ্যানের পেছনের দিকটায় ছনক্ষেতের পাশে একটি গাছের নিচে। দু’জনই মাঝবয়সী। মহিলা যত জোরে কথা বলে পুরুষ লোকটি কণ্ঠস্বর তত নিচু করে জবাব দেয়। ভাড়ার টাকা ঘণ্টায় ১০০ না ১৫০ কথা কাটাকাটি তা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত মহিলার পুলিশ ডাকার হুমকিতে চাহিদামতো ভাড়ার টাকা পরিশোধ করে কেটে পড়ে পুরুষ লোকটি।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সংসদ ভবন এলাকায় চন্দ্রিমা উদ্যান ঘুরে দেখা যায় নানা রঙ্গরসের কায়কারবার। নানা বয়সের কপোত-কপোতী গুটিসুঁটি বেঁধে বসে আছে জোড়ায় জোড়ায়। আছে নানা বয়সের জোড়া কিশোর-কিশোরী থেকে মাঝবয়সী। তবে টিনএজারদের সংখ্যাই বেশি। আছে স্কুল-কলেজ সহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রী। জোড়ায় জোড়ায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্তরঙ্গ পরিবেশে একে অপরের কাছাকাছি থেকে সময় কাটিয়ে পড়ন্ত বেলায় বাড়ি ফেরে এরা। দিনের বেলায় আসা বেশির ভাগই স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী। বিকালে বেশির ভাগ আসেন অফিস-আদালতের কর্মজীবীরা। চন্দ্রিমা উদ্যানের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে ভাড়ায় পাওয়া যায় ডেট পার্টনার। উদ্যান ঘিরে আছে একটি চক্র। ওই চক্রের সদস্য আছে নারী-পুরুষ। উদ্যানের ভেতরে কাউকে একা বসা দেখলে ওই চক্রের সদস্যরা কৌশলে ডেট পার্টনারের প্রস্তাব দেয়। কেউ রাজি হয়, কেউ হয় না। খদ্দেরের চাহিদা মোতাবেক মোবাইলে কল করে আনা হয় ডেট পার্টনার। ভাড়া ঘণ্টা হিসেবে ৫০ থেকে ২০০ টাকা। সঙ্গে হালকা চিপস, বিস্কুট সহ কোমল পানীয়। নিরাপত্তার সমস্যা নেই। নিরাপত্তার জন্য আছে উদ্যানের কিছু কর্মচারী সহ এলাকার মাস্তান, ডেটিং পার্টনারের ভাড়ার একটি অংশ যায় তাদের পকেটে। দিনের বেলা কোন ঝামেলা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালে সে আয় পুলিশের। তাছাড়া, সন্ধ্যা নামলে সক্রিয় হয় পুলিশ। তাতে বেশ কিছু পকেটে পড়ে তাদের।
ভাড়া খাটা ডেটিং পার্টনারদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয় কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা। সোজা কথায় বলা চলে ব্ল্যাকমেইল। গত বৃহস্পতিবার বিকালে চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘটে এমনই একটি ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা। একটি সরকারি অফিসের কর্মকর্তা তিনি। ভাড়ায় ডেটিং পার্টনার ঠিক করে ঘণ্টা দুয়েক সময় অন্তরঙ্গ পরিবেশে কাটানোর পর চুক্তিমাফিক ঘণ্টায় ১০০ টাকা হিসেবে ২০০ টাকা পরিশোধ করে উঠতে চান তিনি। ডেট পার্টনার কিশোরীর দাবি ১০০০ টাকায় চুক্তি হয়েছে, ১০০০ টাকাই দিতে হবে। চিৎকার-চেঁচামেচি করে ঝামেলা পাকিয়ে নেয় কিশোরী। শেষ পর্যন্ত পুরো টাকা দিয়েই দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন ওই কর্মকর্তা।
চন্দ্রিমা উদ্যানের প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে গাছের ছায়ায় সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা আছে প্লাস্টিকের চেয়ার। চেয়ারগুলো আগত অতিথিদের জন্য। এখানে বসে কথা বলা যাবে, গল্প করা যাবে, বিনিময়ে ফেরার সময় কিছু অর্থ দিতে হবে ওদের। চেয়ারের নির্দিষ্ট কোন ভাড়ার রেট নেই। তবে ভাড়ার চেয়ে বেশি সেটা টের পাওয়া যায় চেয়ার ছেড়ে ওঠার পর।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open