যেভাবে তৈরী হচ্ছে পাখির নিরাপদ ঘরসংসার

সিরাজগ​ঞ্জের শাহজাদপু​র উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের আগনুকালী গ্রামে গাছে বাঁধা কলসিতে বসে আছে পাখি। রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে, জমির পাশে, বিভিন্ন বাসাবাড়ির গাছের ডালসহ গ্রামটির আনাচকানাচের বিভিন্ন গাছের মগডালে বেঁধে দেওয়া হয়েছে কলসি। কয়েকটি মাটির কলসিতে পাখিরা এসে আশ্রয় নিয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের জন্য ঘরসংসার। শুরু হয়েছে প্রজনন-প্রক্রিয়াও। গ্রামটি যেন এখন পাখিদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে।
এমন ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের আগনুকালী গ্রামে। পাখিপ্রেমিক মামুন বিশ্বাসের চেষ্টায় এ গ্রামে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে পাখির অভয়াশ্রম। নিজ অর্থায়নে তিনি পাখিদের জন্য ঘরসংসার গড়ে দিচ্ছেন। মামুনের এই কাজে তাঁকে সহায়তা করছেন বন্ধু ইমন, শাহীন, সুজন, নবী, আজিজুল। মামুনের এমন ব্যতিক্রমী কাজে মুগ্ধ গ্রামবাসীসহ আশপাশের লোকজন।

মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দশ মাসে ৫৯৫টি গাছে এ রকম মাটির কলস ও চড়ুই পাখির জন্য বাঁশের চোঙা বেঁধে দিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া আশপাশের লিছিমপুর, রায়পাড়া, সিকদারপাড়া, মধ্যপাড়া, সাতবাড়িয়া, ভেন্নাগাছি, লক্ষ্মীপুরসহ দশটি গ্রামে গাছে কলসি বাঁধার প্রক্রিয়া চলছে।

ওই গ্রামের যুবক সবুজ হোসেন জানান, প্রথম দিকে গ্রামবাসীর তেমন সাড়া না পেলেও পাখিদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করায় এখন সবাই এ কাজে উৎসাহ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন।

মামুনকে সহায়তাকারী আজিজুল ও শাহিন জানান, মাটির কলসিগুলোতে শালিক পাখি বাসা বেঁধেছে, বেশ কটিতে বাচ্চা ফুটেও বের হয়েছে।

তবে অন্য প্রজাতির পাখিদের মধ্যে দোয়েল ওই কলসিগুলোতে যাতায়াত করলেও স্থায়ীভাবে বাস করছে না।

মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘পাখিদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা না গেলে ধীরে ধীরে পাখি কমে যাবে। ইতিমধ্যে আমাদের দেশের কিছু পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই গত বছরের ডিসেম্বর মাসে গাছে গাছে প্লাস্টিকের বাক্স বেঁধে পাখির অভয়ারণ্য সৃষ্টির উদ্যোগ নিই। তবে প্লাস্টিকের বাক্সে সফলতা না পাওয়ায় চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে মাটির কলসি স্থাপনের কাজ শুরু করি। গাছের ডালে পাখির আবাসের জন্য কলসি বাঁধছেন মামুন বিশ্বাসপ্রথমে নিজ বাড়ির গাছে পাঁচটি কলস বাঁধি। কিছুদিন যেতেই এসব কলসে আশ্রয় নেয় শালিক পাখি।’ তিনি অবাক হয়ে দেখতে থাকেন পাখিদের ঘরসংসার, বংশবৃদ্ধি। এরপর শুরু হয় গ্রামের গাছে গাছে কলস লাগানোর কাজ। এতে সাফল্যও আসে। প্যাঁচা ও শালিক এখানে বাসা বাঁধছে। অন্যান্য পাখির মধ্যে দোয়েল আসা-যাওয়া করছে। অন্যান্য প্রজাতির পাখির আবাসস্থল গড়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।

মামুন আরও জানান, পাখি সংরক্ষণ, প্রজনন ও নিরাপদ বাসস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘দি বার্ড সেফটি হাউজ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষকে সচেতন করতে এলাকায় লাগানো হয়েছে বেশ কিছু ব্যানার। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শাহজাদপুর উপজেলাজুড়ে পাখির নিরাপদ বাসস্থান গড়ে তুলবেন বলে তিনি জানান।

রাজশাহী বিভাগের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি বিভাগের বন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আগনুকালী গ্রাম নদীর পাশে। ওই গ্রামটি পাখির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পাখির জন্য অভয়াশ্রম সৃষ্টির এ উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। এ বিষয়ে তাঁদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

মামুনের এই কাজে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিয়েছেন তাঁর বাবা মাহবুবুল হোসেন ও বড় ভাই মুক্তা বিশ্বাস।

পাখি প্রেমিক মামুন বিশ্বাস একজন ব্যবসায়ী। পাশাপাশি শাহজাদপুরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open